August 9, 2026, 8:41 am

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবৃত্ত

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবৃত্ত

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সাতটি শিক্ষানীতি/ কমিটি প্রণীত হলেও কোন শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। কারণ শিক্ষানীতির সঙ্গে গড়ে উঠে রাজনৈতিক সম্পর্ক। প্রতিটি শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে সরকারের সদিচ্ছার অভাব, ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। স্বাধীনতার পর দেশে যে সকল শিক্ষানীতি প্রণীত হয় সে গুলো হচ্ছে-

(১) ড. খুদরত- ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-১৯৭৪।
(২) অন্তর্বর্তী শিক্ষানীতি- ১৯৭৯।
(৩) মজিদ খান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-১৯৮৩।
(৪) মফিজ উদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-১৯৮৭।
(৫) ড. সামশুল হক শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-২০০০।
(৬) মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা সংস্কার রিপোর্ট-২০০৩।
(৭) অধ্যাপক কবির চৌধুরী শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট- ২০০৯।
এ সকল শিক্ষানীতিগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিটি সরকার তার মেয়াদের শেষ দিকে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় । কিন্তু ক্ষমতা পরিবর্তনের ফলে পূর্ববর্তী সরকারের প্রণীত শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে প্রতিটি সরকার নিজেদের কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য নতুন করে শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। কমিশন সরকারি প্রস্তাবনানুসারে ১৯৭৩ সালের জুন মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে খসড়া রিপোর্ট পেশ করেন। ১৯৭৪ সালের ৩০ মে কমিশন চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেন। ৩৬ অধ্যায়ে বিভক্ত প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টে সকল নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতান্ত্রিক সমাজ সৃষ্টিকে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম কুদরতি খুদা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী একত্রে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। বেসরকারি শিক্ষকদের ভাতা নির্ধারণ ও রেশনের ব্যবস্থা করেন। ১৫ই আগস্ট’৭৫ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার ফলে এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষা কমিশন (কাজী জাফর- আবদুল বাতেন) পূর্বের কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আংশিক বহাল রেখে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। কিন্তু’ জিয়াউর রহমান এর হত্যাকাণ্ডের পর এই রিপোর্ট আর আলোর মুখ দেখেনি।
এইচএম এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ১৯৮৩ সালে মজিদ খান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এই রিপোর্টে ছাত্রদের বেতন বৃদ্ধির কথা উল্লেখ থাকায় ছাত্ররা এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। পরে এই শিক্ষানীতি বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার। পরবর্তীকালে মফিজ উদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এই শিক্ষানীতির কিছু অংশ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল। এই শিক্ষানীতির আলোকে ইংরেজি শিক্ষার পুনঃপ্রবর্তন, মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা, ছাত্রসংসদ নির্বাচন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন আর এগোয়নি।

১৯৯৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হলে মেয়াদের শেষ দিকে ২০০০ সালে ড. সামশুল হক শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আলোকে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। ওই শিক্ষানীতি ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতির আদলে প্রণীত হয়েছিল। সংসদে শিক্ষানীতি পাসও হয়েছিল কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে কাজ শুরু হওয়ায় আর বাস্তবায়ন হয়নি।
অবশেষে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবারো ক্ষমতায় এলে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট এবং ২০০০ সালের ড. সামশুল হক শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আলোকে ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং অর্থনীতিবিদ ড. খালেকুজ্জামানকে কো-চেয়ারম্যান করে ১৮ সদস্যের শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। কমিটি শিক্ষানীতির চূড়ান্ত খসড়া ২ সেপ্টেম্বর-২০১০ সরকারের কাছে পেশ করে। ৭ ডিসেম্বর’১০ মহান জাতীয় সংসদে এ শিক্ষানীতি পাস হয়। এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকার ২৪টি সাব-কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়ন যাত্রা শুরু করে। এই শিক্ষানীতির শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, সবরকম বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। “এই শিক্ষানীতির ২৫তম অধ‍্যয়ে বলা হয়েছে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সতন্ত্র বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। শিক্ষকদের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রনোদনা প্রদান করা হবে”। ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উল্লেখিত সুবিধা দেয়া তো দূরে থাক, প্রচলিত বেতন কাঠামোর সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষকদের ভাতা নিন্মে এটি জাতীর জন্য লজ্জার।

একটি স্বাধীন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ৪৯ বছর ধরে পরিকল্পনা বিহীন চলতে পারে এটা চিন্তারও বাইরে। অথচ প্রতিটি সরকারের বাজেট ঘোষণায় বলা হয়েছিল, শিক্ষার উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বিগত সরকারগুলোর শিক্ষার প্রতি চরম উদাসীনতা বিদ্যমান বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করি। সমানভাবে দায়ী আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ, শিক্ষক নেতৃত্ব, শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগী ব‍্যাক্তিবর্গ।
মূলতঃ কাউকে দোষারোপ করে নয়, শিক্ষার উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের প্রতিটি শ্রেণী পেশার মানুষদের। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিশ্বের সাথে টিকে থাকতে হলে আমাদের প্রথমেই নজর দিতে হবে শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা ও সচ্ছলতা রক্ষায়। শিক্ষকদের অসচ্ছল ও অভুক্ত উদরে রেখে মানসম্মত শিক্ষার প্রত‍্যাশা করা অবান্তর। যে শিক্ষকরা বিজ্ঞানমনস্ক, প্রযুক্তিনির্ভর, আদর্শ, সৎ,ও দেশপ্রেমিক জনশক্তি তৈরি করবেন সর্বাগ্রে সেই শিক্ষকদের সচ্ছলতা ও মর্যাদাশীল করা জরুরি। অন্যথায় শিক্ষানীতির কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

সবার মনে রাখতে হবে,একজন শিক্ষার্থীর জীবনে মাধ‍্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্তর। কেননা এই স্তরের শিক্ষা সমাপ্তির পর শিক্ষার্থীরা হয় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে অথবা উচ্চ শিক্ষার দিকে ধাবিত হয়। সেহেতু জীবন মুখী শিক্ষা হলো মাধ‍্যমিক শিক্ষা (দ্বাদশ শ্রেণি)। তাই এই স্তরের শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা জরুরি। প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর মানুষের সন্তানদের শিক্ষা সহজলভ্য করতেই এমপিও শিক্ষা জাতীয়করণ করা প্রয়োজন। বিশ্বের প্রায় দেশেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণকৃত। বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাকে এমপিও খাতে রেখে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। তাই সকলের একটিই স্লোগান হোক-” সকল নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণ, একমাত্র সমাধান এমপিও শিক্ষা জাতীয়করণ”।

লেখক
মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম

নিউজটি শেয়ার করুন

Comments are closed.




© All rights reserved © 2020 districtnews24.Com
Design & Developed BY districtnews24.Com